মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর ২০২১, ০৫:৩২ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
NEWSS24 অনলাইন সংবাদ পত্রে আপনাকে স্বাগতম । বিজ্ঞাপনের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন  । ধন্যবাদ

দেশের গবেষণা এগিয়ে নিতে চুয়েট শিক্ষকের অসাধারণ উদ্যোগ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপডেটের সময় : সোমবার, ৭ জুন, ২০২১
দেশের গবেষনা এগিয়ে নিতে চুয়েট শিক্ষকের অসাধারণ উদ্যোগ

Spread the love

বিশ্ববিদ্যালয় মাত্রই জ্ঞানের পঠন,পাঠন ও সৃজন এর তীর্থস্থান। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের পঠন-পাঠন এর কাজ চললেও নতুন জ্ঞান সৃজনের তথা গবেষণার কাজে অনেকটাই পিছিয়ে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রতিবছর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‍্যাংকিং এ।

সাধারণত দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় চার বছরের স্নাতকের চূড়ান্ত বছরে আন্ডারগ্র্যাডুয়েট থিসিস এর ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের পূর্ব অভিজ্ঞতার অভাব ও সময় সল্পতার কারণে অনেক সময়ই কাঙ্খিত মানের সাফল্য অর্জন সম্ভব হয় না। এছাড়া গবেষণা তহবিল ও অবকাঠামোর অভাব ত রয়েছেই।

তুরস্কের কারাবুক বিশ্ববিদ্যালয়ে রেক্টর এর সাথে

গবেষণার ময়দানে এই দৈন্যদশায় আশার আলো দেখাচ্ছেন জনাব ছাবির হোসাইন। তিনি  চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কম্পিউটার কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। শুরুর গল্পটা শুনছিলাম তাঁরই মুখে। চুয়েটের এক অনুষ্ঠানে যন্ত্রকৌশল বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আব্দুল ওয়াজেদ বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণের স্থান। সেই কথা দ্বারা প্রচন্ড অনুপ্রাণিত হয়েই শুরু। ২০১৮ সালের ৩০ মার্চে Airline Scheduling with Max Flow Algorithm নামক তার প্রথম পেপারটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে প্রকাশ করেছেন হয়েছে আরও ২৩ টি গবেষণা প্রবন্ধ। ঘুরে আসতে পারেন গবেষকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রিসার্চগেট এ তাঁর প্রোফাইল হতে।

https://www.researchgate.net/profile/Md-Hossain-419?fbclid=IwAR3yBViN7R1h5-Cjw4GW_6ucXCugFWri9_o2NjYvLXnimll7C2aGLkeCeZU

শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকার সুবাদে তিনি গত তিন বছর ধরে চুয়েটের কম্পিউটার কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের অ্যালগরিদম ডিজাইন অ্যান্ড এনালাইসিস কোর্সটি পরিচালনা করে আসছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা পরিস্থিতি উন্নয়নে চিন্তা করলেন কোর্সটির মৌলিক বিষয় পড়ানোর পাশাপাশি কোর্সওয়ার্ক হিসেবে শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও প্রোজেক্ট করতে উৎসাহিত করার কথা।শুরু করলেন প্রতিবছর সেমিস্টারের শেষে এ নিয়ে পোস্টার প্রেজেন্টেশনের ব্যবস্থা।

অ্যালগরিদম ডিজাইন ল্যাবে পাঠদানরত

শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বজুড়েই স্নাতক ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের স্বীকৃত জার্নালে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ বিরল ঘটনা। আর তা যদি হয় কম্পিউটার কৌশলের অ্যালগরিদমের মত জটিল বিষয়ে তাহলে সোনায় সোহাগা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা ও জনাব ছাবির হোসাইনের  নিরলস প্রচেষ্টার কারণে প্রায় বারোটিরও অধিক প্রকাশনা দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে। আরো কিছু গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এই কাজগুলো আই ট্রিপলই (IEEE) স্পনসরড কনফারেন্স, থমসন রয়টার্স ইন্ডেক্সড জার্নাল, স্কোপাস (SCOPUS) ইন্ডেক্সড স্প্রিঞ্জার (Springer) বুক সিরিজসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কনফারেন্স ও জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি International Conference on Advances in Science, Engineering and Robotics Technology (ICASERT-2019), International Joint Conference on Computational Intelligence (IJCCI-2019), International Conference on Cyber Security and Computer Science (ICONCS-2020), International Conference on Computing Science, Communication and Security (COMS2-2020), EMITTER International Journal of Engineering Technology ইত্যাদি।

 

গত বছর এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (Asian University for Women) কর্তৃক আয়োজিত ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স অন ন্যাচারাল সাইন্স এন্ড টেকনোলজি (ICNST-2019) তে অংশ নিয়ে তাঁর ছাত্রী মালিহা জাহান চৌধুরী আইসিটি সেকশনে শ্রেষ্ঠ গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পুরস্কার অর্জন করেন। তার সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন একই ব্যাচের ছাত্রী কানিজ ফাতেমা তন্নী। জনাব ছাবির হোসাইনের তত্ত্বাবধানে তাদের গবেষণার বিষয় ছিল প্রোগ্রামিং ল্যাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত কোড সমূহে প্লেগারিজম (মিল) বের করা।

একই কোর্সে শিক্ষার্থীদের কাজ থেকে দুটি গবেষণাপত্র গত ২৭ মার্চ, ২০২০ ইং তারিখে গুজরাটস্থ গণপত বিশ্ববিদ্যালয় (Ganpat University) কর্তৃক আয়োজিত International Conference on Computing Science, Communication and Security (COMS2) – তে উপস্থাপিত হয়েছে। এতে অন্য গবেষকেরাও অংশ নেন। করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অচলাবস্থার কারণে কনফারেন্সটি ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর ছাত্র তানজিন আহমেদ ও স্নেহলতা মন্ডল প্রবন্ধদ্বয় উপস্থাপন করেন। তাদের উপস্থাপিত প্রবন্ধদ্বয়ের শিরোনাম যথাক্রমে “A new Approach to Solve Job Sequencing Problem using Dynamic Programming with Reduced Time Complexity” এবং  “Optimizing Complexity of Quick Sort”। দুটি গবেষণাকর্মেই মূলত তত্ত্বীয় কম্পিউটার বিজ্ঞানের অ্যালগরিদম ডিজাইন ও এনালাইসিস নিয়ে কাজ করা হয়েছে। উপস্থাপিত প্রবন্ধগুলো পরবর্তীতে Springer এর Communications in Computer and Information Science (CCIS) নামক বুক সিরিজে প্রকাশিত হবে যার Scopus, Web of Science, ACM DL, DBLP, ইত্যাদি ইন্ডেএক্সিং আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪র্থ বর্ষে থিসিস বা প্রজেক্ট করানো হলেও ২য় বর্ষের কোর্স বিষয়ক গবেষণা ও প্রকাশনা খুবই অপ্রতুল। আমি খুবই আনন্দিত ও আশাবাদী যে, এই শিক্ষার্থীরা ২য় বর্ষেই গবেষণার যে হাতেখড়ি পেয়েছে তা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করবে”, বলছিলেন তিনি।

তাঁর গবেষণার বিষয়ে জানালেন,

“আমি মূলত অ্যালগরিদম কোর্সের সাথে প্রাসঙ্গিক বিদ্যমান বিষয়গুলোকে নতুনভাবে সমাধানের অথবা বিদ্যমান সমাধানসমূহকে আরো উন্নত করার চেষ্টা করি। কিভাবে অ্যালগরিদমের জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রাত্যহিক জীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা যায় সেই চেষ্টাও করি। যেমন ধরুন এয়ারলাইন শিডিউলিং এমনভাবে করা যাতে এরোপ্লেন গুলো অধিকাংশ সময় ফ্লাইট মুডে থাকে এবং  প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ লাভ হয়; অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ ব্যবহার করে সহজে নির্দিষ্ট এলাকায় রক্তদাতা কে খুঁজে বের করা; ভ্রমণপিপাসুদের শারীরিক কষ্ট কমাতে সহজে টুরিস্ট স্পটগুলোকে খুঁজে বের করা; কম মূল্যের এবং কাছাকাছি ওষুধের দোকান খুঁজে বের করা; কাছাকাছি কম খরচের সিট খালি আছে এমন হাসপাতাল খুঁজে বের করা; ভাড়া বাসা খুঁজতে সহযোগিতা করা; র‍্যাগিং ঠেকানোর জন্য প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ তৈরি করা; ফ্রিল্যান্সারদের লাভজনক কাজ বেছে নেওয়ার জন্য সহযোগিতা করা; কার্যকর গ্রাফ সার্চ পদ্ধতি দেয়া; জেনেটিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন; ট্রাভেলিং সেলসম্যান সমস্যার কার্যকর সমাধান করা; ইত্যাদি।”

 

শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাথেও যুক্ত হয়ে গবেষণা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টুয়ার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আসাদ কবির, কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ড. এনামুল হক প্রিন্স, আমেরিকার হিউস্টোন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোঃ মাইনুল ইসলাম, ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া পাহাং এর ড. মুহাম্মাদ নোমানী কবির প্রমুখ। মূলত মেশিন লার্নিং রেকমেন্ডার সিস্টেম ডিজাইন, অ্যালগরিদমের কম্পেক্সিসিটি এনালাইসিস, অগমেন্টেড রিয়্যালিটি, কম্পিউটার ভিশন, তথ্য পুনরুদ্ধার ও প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা করেন বলে জানালেন।

বাংলাদেশে স্বীকৃতি ও প্রণোদোনাহীন পরিবেশে অব্যাহত গবেষণায় কেন মনোনিবেশ করলেন জানতে চাইলে জানালেন,” আমি চাই বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ই জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত হোক। শুধু চূড়ান্ত নয়, যেকোন বর্ষের শিক্ষার্থীরা যাতে গবেষণা করতে পারে সে বিষয়ে জোর দেয়া দরকার। এজন্য কনফারেন্সে গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য রেজিষ্ট্রেশন ফি প্রদানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা বাড়ানো দরকার। আশা করি আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েরও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উদ্বুগ্ধ  করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিনত হবে।”

ইতিমধ্যেই তাঁর সাথে যোগাযোগ করে বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী গবেষণা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের গবেষণার হাতে খড়ি শেখানোর জন্য তিনিও গ্রহণ করেছেন নানা উদ্যোগ । এরমধ্যে রয়েছে জুম সফটওয়ার ব্যবহার করে বেসিক রিসার্চ মেথড শেখানো, ফেসবুক গ্রপ (গবেষক হতে চাই ) এর মাধ্যমে গবেষণার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে আলোচনা, যুক্ত গবেষণা পরিচালনাসহ আরও অসংখ্য গঠনমূলক কাজ ।

জনাব ছাবির হোসাইনের মত উদ্দোমী শিক্ষকদের পরিশ্রম আমাদের আশায় বুক বাধায়। স্বপ্ন দেখায় এক আলোকিত বাংলাদেশের।

 


আপনার মতামত লিখুন :    
এ জাতীয় আরো সংবাদ